
অস্বচ্ছল মেধাবীদের স্বপ্নপূরণে আসপাডা: বার্ষিক শিক্ষার অগ্রগতি বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত
“মেধা ঝরতে দেব না - অর্থের অভাব হবে না” - এই মানবিক অঙ্গীকারকে হৃদয়ে ধারণ করে সমাজের অস্বচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আলোয় এগিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া মাসিক শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রম ইতোমধ্যে শত শত শিক্ষার্থীর জীবনে নতুন সম্ভাবনা ও স্বপ্নের দ্বার খুলে দিয়েছে।এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে শনিবার (২২ আগস্ট) ময়মনসিংহ সদরের দিঘারকান্দা বাইপাস মোড়ে অবস্থিত আসপাডা প্রশিক্ষণ একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয় “আসপাডা থেকে মাসিক বৃত্তিপ্রাপ্ত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বার্ষিক শিক্ষার অগ্রগতি বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠান - ২০২৬”।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উম্মে হাবীবা মীরা। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. রোকন-উদ-দৌলা।অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক লায়ন আলহাজ মো. আবদুর রশিদ।স্বাগত বক্তব্যে লায়ন আলহাজ মো. আবদুর রশিদ উপস্থিত অতিথি, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি শিক্ষাখাতে আসপাডার দীর্ঘদিনের কার্যক্রম, অর্জন এবং শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচি শুরুর পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।তিনি বলেন, সমাজে এমন অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের স্বপ্ন আছে, যোগ্যতা আছে; কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের অনেকের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেইসব শিক্ষার্থীর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতেই আসপাডার এই পথচলা।আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ করা পর্যন্ত আসপাডা যে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে, তা কোনোদিন ফেরত দিতে হবে না। শিক্ষার্থীদের কাছে তার একমাত্র প্রত্যাশা - তারা প্রতিষ্ঠিত ও স্বাবলম্বী হওয়ার পর নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজের অন্য কোনো অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াবে।তিনি আরও বলেন - আসপাডা আজ তোমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, একদিন তোমরাও যেন অন্য কারও স্বপ্ন পূরণের সঙ্গী হও। সমাজে ভালো কাজের এই ধারাবাহিকতাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।ভবিষ্যতেও এই শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে আবদুর রশিদ বলেন, আসপাডার বৃত্তিপ্রাপ্ত মেধাবীদের মধ্যে কেউ পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেলে, তাদের জন্য আসপাডার পক্ষ থেকে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার এ বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষার্থী, প্রাক্তন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ও অতিথিদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।প্রধান আলোচক মো. রোকন-উদ-দৌলা বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আসপাডার এই মহতী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছেন। শিক্ষাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ মানবিক ও নিঃস্বার্থভাবে অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ সত্যিই অনুকরণীয়।তিনি বর্তমান ও প্রাক্তন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করলেই চলবে না; শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন সেই জ্ঞান ও যোগ্যতা দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে। তিনি শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে দেশের উন্নয়ন ও সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক উম্মে হাবীবা মীরা আসপাডার এমন মহতী ও ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সমাজের অস্বচ্ছল কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের শিক্ষাজীবনকে এগিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।তিনি বলেন - অর্থের অভাবে যেন কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থেমে না যায়, আসপাডা সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার যে দায়িত্ব নিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।তিনি শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে বলেন, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। তাই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।নারী শিক্ষার প্রসার এবং নারীদের সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন উজ্জ্বল উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আসপাডা ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও সমহারে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করছে - এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ জন্য তিনি আসপাডাকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে আসপাডার জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা প্রশাসন সবসময় পাশে থাকবে বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নেত্রকোনা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফারজানা পারভীন, আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কার্যক্রম) সুদেব চন্দ্র রায় এবং পরিচালক (মানবসম্পদ) শরিফ রায়হান।অনুষ্ঠানে উপস্থিত বর্তমান বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষাজীবন, পারিবারিক সংগ্রাম এবং পড়াশোনার অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, আসপাডা পাশে না দাঁড়ালে অর্থের অভাবে তাদের অনেকের পড়াশোনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ত; কারও কারও শিক্ষাজীবন হয়তো মাঝপথেই থেমে যেত। আসপাডার সহযোগিতায় তারা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন অংশ ছিল প্রাক্তন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণ। আসপাডার সহায়তায় পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাদের দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রায় আসপাডার ভূমিকার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।তারা বলেন, আসপাডা পাশে না দাঁড়ালে হয়তো তাদের অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত কিংবা জীবনের স্বপ্নপূরণের পথ এতদূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো না। আজ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন সেই সময়ের কথা, যখন আসপাডার মতো একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে দাঁড়িয়ে জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুভূতি প্রকাশ করেন মাকসুদুল আলম নাঈম (বিসিএস -কর), ডা. মো. নাঈম মিয়া, ভেটেরিনারি সার্জন (বিসিএস), এবং অতিকুল ইসলাম, যিনি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস-এ মৎস্য গবেষক হিসেবে কর্মরত।উল্লেখ্য, আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীকে মাসিক শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন। তাদের মধ্যে ২০ জনেরও বেশি বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কেউ প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে, কেউ চিকিৎসা, ব্যাংকিং, প্রকৌশল, শিক্ষা ও গবেষণাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।আসপাডার বৃত্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বিসিএস কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার, আইনজীবী, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার এবং দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা।বর্তমানে আসপাডার মাসিক শিক্ষাবৃত্তিপ্রাপ্ত অধিকাংশ শিক্ষার্থীই সমাজের অত্যন্ত অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। আসপাডার আর্থিক ও মানবিক সহায়তায় তারা দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের পদচারণা আসপাডার দীর্ঘদিনের এই কার্যক্রমের সাফল্যের উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করছে।শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনের কঠিন সময়ে ছায়ার মতো পাশে দাঁড়ানোর জন্য আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক লায়ন আলহাজ মো. আবদুর রশিদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য অতিথিরাও আসপাডার শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তারা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী যেন ঝরে না পড়ে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আসপাডার এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার এবং এই মহতী কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।আলোচনা, অনুভূতি প্রকাশ এবং আগামী দিনের স্বপ্ন ও প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন যেন হয়ে উঠেছিল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য মিলনমেলা।সবশেষে মোনাজাত এবং মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের উপস্থাপক মীর আহসান হাবীব বাপ্পী।