
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
পেশায় রিকশাচালক চল্লিশ বছর বয়সী সবুজ। ভোরে বের হন জীবিকার তাগিদে, গ্রীষ্মের প্রবল তাপদাহে সকাল আটটা পেরোতেই সূর্যের তাপ যেন গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দুপুরের আগেই রাজধানীর ফুটপাত, ফ্লাইওভার, কংক্রিটের ভবন আর পিচঢালা সড়ক যেন বিশাল এক চুল্লিতে পরিণত হয়। সন্ধ্যার পরও স্বস্তি মেলে না। এরমধ্যেই রিকশা চালিয়ে ঘরে ফেরেন মধ্যবয়সী এই মানুষটি। তবে সেখানেও নেই শান্তি, শহরের কংক্রিট সারাদিনের সঞ্চিত তাপ ধীরে ধীরে ছাড়ে রাতভর। ফলে সবুজের মতো রাজধানীবাসী এখন শুধু দিনের গরম নয়, রাতের গরমেও অতিষ্ঠ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি গ্রীষ্মের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নয়। গরম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গাছপালা কমে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট
কংক্রিটের নিচে হারিয়ে গেছে ঢাকা
পঞ্চাশ বছর আগের ঢাকার সঙ্গে বর্তমান ঢাকার তুলনা করলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য চোখে পড়ে সবুজ আর পানির পরিমাণে। একসময় রাজধানীজুড়ে ছিল অসংখ্য খাল, বিল, পুকুর, উন্মুক্ত মাঠ এবং বিশাল বৃক্ষ। এখন তার বড় অংশই বহুতল ভবন, শপিং কমপ্লেক্স, পার্কিং এলাকা ও সড়কে রূপ নিয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, একটি শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তিনটি উপাদান, সেগুলো হল- গাছপালা, জলাধার ও খোলা জায়গা। আশংকার বিষয় হল ঢাকায় এই তিনটিই দ্রুত কমেছে।
গাছ সূর্যের আলো আটকে ছায়া দেয়, পাতার মাধ্যমে পানি বাষ্পীভূত করে আশপাশ ঠান্ডা রাখে। অন্যদিকে জলাশয় তাপ শোষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। খোলা জায়গা বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি করে। এই তিনটি উপাদান কমে যাওয়ার ফলে ঢাকার প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে বলে মনে করেন পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা যেন এখন এক Urban Heat Island (UHI), যেখানে শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। এর প্রধান কারণ, কংক্রিট, অ্যাসফল্ট, কাচের ভবন, যানবাহনের তাপ, শিল্পকারখানা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বহির্গত গরম বাতাস। এই উপকরণগুলো দিনে বিপুল তাপ শোষণ করে এবং রাতে ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয়। ফলে শহরের রাতও গরম থাকে।
তাপ কমাতে সরকারের উদ্যোগ
ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার ও দুই সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে অসংখ্য প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের সফলতা বাস্তবে খুবই নগন্য। দুই সিটির রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণ, পার্ক উন্নয়ন, লেক সংস্কার, খালপূর্ন:খনন, ছাদবাগান, খালপাড় সবুজায়নের মত কর্মসূচি অন্যতম। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে উত্তরার মিয়াওয়াকি বন তৈরী করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এই প্রকল্পের অনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয় গেল বছরের নভেম্বর মাসে। দ্বিতীয় দফায় গাছ লাগানো শুরু হয় গত মে মাসে। বর্তমানে তৃতীয় দফায় বৃক্ষ রোপনের জন্য মাটি প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে।
দিয়াবাড়ি ৪ নম্বর ব্রিজ সংলগ্ন ১১ নম্বর লেকপাড়ের এই বনের আয়তন প্রায় ৩ দশমিক ২ একর। সেখানে মোট আড়াইশ প্রজাতির প্রায় ৫৩ হাজার ৪০০ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের। কৃত্রিম এই বনে দেশীয় ফলদ, ফুল, ঔষধি, কাঠ, ঝোপ, গুল্মসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে। তবে প্রাধান্য পাচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছ। গেল নভেম্বরে শুরু এই প্রকল্পের গাছ মাত্র আট মাসে এটি ঘন বনে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন রয়ে গেছে, হাজার হাজার গাছ লাগানো হলেও কি তাপমাত্রা কমেছে? যদি কমে তাহলে কত ডিগ্রি কিংবা কত এলাকাজুড়ে কমেছে, তার কোন গবেষণা হয়নি এখনো। তাই শুধু গাছ লাগিয়ে থিম না থেকে এর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে করেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামানের মতে, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, এর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নও জরুরি। বন তৈরির আগে সেখানে কী পরিস্থিতি ছিল, এখন কী অবস্থা সেটি দেখতে হবে। বৈজ্ঞানিক এই পরিসংখ্যান হাতে পেলেই এই বনের সফলতা কিংবা ব্যর্থতা অনুমান করা যাবে। তিনি বলেন, প্রকল্প শুরু হওয়ার আগে ও পরে, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, জীববৈচিত্র্য, কার্বন শোষণ, বায়ুর মান পরিমাপ করতে হবে।
ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা পরিকল্পনার অভাব বলে মনে করে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান। তার মতে, যেখানে-সেখানে গাছ লাগিয়ে সমাধান হবে না। সড়কের দুই পাশে, খালপাড়ে, সরকারি খালি জমিতে, পার্কে বিপুল পরিমানে গাছ লাগানো যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় দেশীয় গাছ লাগাতে হবে। তাতে পরিবেশের উন্নতি হবে।
আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট নগর বন, খাল পুনরুদ্ধার, লেক সংরক্ষণ, গ্রিন রুফ বাধ্যতামূলক, কুল রুফ ব্যবহার, নতুন ভবনে গাছ বাধ্যতামূলক, স্যাটেলাইট দিয়ে হিট ম্যাপ তৈরি, রাস্তার পাশে বড় ছায়াদানকারী গাছ,স্কুলভিত্তিক সবুজায়ন এবং এসব কাজে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করতে পারলে সুন্দর শহর গড়া সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আগামী দশকে আরও বাড়বে। এর সঙ্গে যদি একইভাবে কংক্রিটের বিস্তার চলতে থাকে, তাহলে রাজধানীতে তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ ও তীব্র হবে। অন্যদিকে, যদি এখন থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক নগর পরিকল্পনা, জলাধার সংরক্ষণ, বৃহৎ পরিসরে দেশীয় বৃক্ষরোপণ, সবুজ করিডোর, ছাদবাগান এবং মিয়াওয়াকির মতো প্রকল্পগুলোকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে ঢাকার স্থানীয় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
গরমেরে সাথে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা ও অনুভূত তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে। টানা গরম, উচ্চ আর্দ্রতা এবং নগরজুড়ে কংক্রিটের বিস্তারের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যেমন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, তেমনি বাড়ছে গরমজনিত নানা রোগের প্রকোপ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হিট এক্সহসশন, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, কিডনির জটিলতা এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করলে শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে জীবনহানির ঘটনাও ঘটতে পারে। গরমে হাসপাতালগুলোতে গরমজনিত অসুস্থতা নিয়ে রোগীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে বেড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, তীব্র তাপদাহে প্রয়োজন ছাড়া দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি ও খাবার স্যালাইন পান করা, হালকা রঙের সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ছায়াযুক্ত স্থান ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে তাপঝুঁকি কমাতে নগরজুড়ে সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ, তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং বৈজ্ঞানিক নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. কামার উদ্দীন মুযাক্কির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘন ঘন তাপপ্রবাহে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর হচ্ছে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার (ESDO) এক গবেষণার সূত্র ধরে তিনি বলেন, গত দুই দশকে দেশে তাপজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু ২০২২ সালেই বাংলাদেশে রেকর্ড ৫৩ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এর ফলে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে কিডনি জটিলতা নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তি প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই চিকিৎসকের মতে, তাপদহের সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে বয়স্ক মানুষ, শিশু, দীর্ঘসময় খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী। অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনির জটিলতা ও অন্যান্য তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
প্রাণহানি কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ডা. মুযাক্কির বলেন, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, সহজে পৌঁছানো যায় এমন শীতল আশ্রয়কেন্দ্র বা কুলিং সেন্টার গড়ে তোলা এবং তাপজনিত রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় টেকসই নগর পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এসব উদ্যোগই ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের ক্ষতি কমিয়ে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।