কেন বাংলাদেশে গরু কোরবানির হার কমছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরু কোরবানির সংখ্যা কমতে দেখা যাচ্ছে।
পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের পশুর হাটগুলোর চেনা চিত্রে বড় বদল এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে পশুর সংখ্যা, বিশেষ করে গরু কোরবানি দেওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। কিন্তু কেন এই নেতিবাচক প্রবণতা? এর পেছনে কি কেবলই লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও গোখাদ্যের আকাশচুম্বী দাম, নাকি মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ও শহুরে জীবনযাত্রার সংকট বড় ভূমিকা রাখছে?
‘এইবার গরু কিনছি ব্যাংকের ঋণ নিয়ে। যদি ঠিকমতো দাম না পাই, তাহলে বিষ খাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের কৃষক শেখ ফরিদ। তিনি জানান, গত বছর কোরবানির ঈদে চারটি গরু পালন করেছিলেন। সব গরু বিক্রি হলেও আশানুরূপ দাম

পাননি। সেই লোকসানের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার গরু কমিয়ে মাত্র একটি পালন করেছেন, সেটিও ব্যাংক ঋণ নিয়ে। শেখ ফরিদের ভাষায়, তিন মণ ওজনের গরুটির পেছনে তার খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। অথচ ক্রেতারা দাম বলছেন এক লাখ টাকার আশেপাশে।
আমার পরিবার সারাবছর গরুটাকে বাচ্চার মতো লালন-পালন করছে। খরচও গেছে অনেক। এখন যদি সেই টাকা না ওঠে, তাহলে এত পরিশ্রমের মূল্য কোথায়?’ — বলেন তিনি।
তিনি জানান, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে গরুর খামারই বন্ধ করে দিতে পারেন। আগে তার গোয়ালে সাতটি গরু থাকলেও এখন ধীরে ধীরে সংখ্যা কমিয়ে আনছেন।
শুধু শেখ ফরিদ নন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারিরাও একই ধরনের হতাশার কথা বলছেন। অনেকেই বলছেন, গরু পালনের খরচ বাড়লেও বিক্রিতে লাভ কমে গেছে। ফলে অনেকে গরু পালন কমিয়ে দিচ্ছেন।
কমছে গরু কোরবানির সংখ্যা
বাংলাদেশে কোরবানির পশুর মধ্যে গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গরু কোরবানির সংখ্যা কমতে দেখা যাচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে কোরবানি হয়েছিল ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার গরু। পরের দুই বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৫৬ লাখ ৫৯ হাজারে।
তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় থেকে এ সংখ্যা কমতে শুরু করে। ওই বছর গরু কোরবানি হয় প্রায় ৫০ লাখ। ২০২১ সালে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪০ লাখে।
পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে গরু কোরবানির সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ লাখ ৬৬ হাজারে। তবে ২০২৫ সালে আবার কমে হয় ৪৬ লাখ ৫০ হাজার।
অর্থাৎ, করোনা পূর্ব সময়ের তুলনায় এখনো গরু কোরবানির সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ কম।
কেন কমছে গরু কোরবানি?
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল মনে করেন, এর পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া।
দ্বিতীয়ত, পশু পালনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় গরুর দাম বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, কম খরচে কোরবানি দিতে অনেকে গরুর বদলে ছাগল বা ভেড়ার দিকে ঝুঁকছেন।
তার ভাষায়, মধ্যবিত্তের অনেক পরিবার এখন এক লাখ টাকার গরুর পরিবর্তে কম দামের ছাগল কিনে কোরবানি দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ও আয় সংকোচনের কারণে বড় পশুর বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাড়ছে খামারিদের খরচ
কেরানীগঞ্জের একটি খামারের ব্যবস্থাপক মো. কবির জানান, এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। তবে খাবার, শ্রমিক ও বিদ্যুতের খরচ বাড়ায় গরুর দামও বাড়াতে হয়েছে।
তার মতে, গত বছরের তুলনায় প্রতি গরুতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বড় গরুর ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি আরও বেশি।
মানিকগঞ্জের খামারি কুদ্দুস মোল্লাও একই কথা বলেন। তার অভিযোগ, গ্রামের খামারিরা অনেক সময় বেপারিদের কাছে কম দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হন। শহরে গরুর দাম বাড়লেও সেই সুবিধা তারা পান না।
তবে এবার নিজেই হাটে গরু তোলার পরিকল্পনা করছেন তিনি, যাতে ভালো দাম পাওয়া যায়।
সরবরাহ বেশি, তবু শঙ্কা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য দেশে প্রায় ৫৭ লাখ গরু ও মহিষ প্রস্তুত করা হয়েছে। গত বছর কোরবানি হওয়া গরুর সংখ্যার তুলনায় এটি প্রায় ১১ লাখ বেশি।
চলতি বছর মোট কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ। এর বিপরীতে কোরবানি হতে পারে প্রায় এক কোটি এক লাখ পশু। অর্থাৎ, প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে।
তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শরীফুল হক বলছেন, এতে খামারিদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কারণ, কোরবানির বাইরে সারা বছরই মাংসের চাহিদা থাকে।
তার ভাষায়, বিয়ে, অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজনের কারণে সারা বছরই গরুর মাংস বিক্রি হয়। ফলে ঈদে বিক্রি না হলেও পরে গরু বিক্রির সুযোগ থাকে।
তবে খামারিদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, ঈদের বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে পরে মাংসের বাজারে গরু বিক্রি করে খরচ ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়া যায় না।
এফ/এইচ