
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
সকাল ৯টা। শহরের সবাই যখন নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকার ফুটপাতে ছোট্ট একটি ভ্যান গাড়িতে করে চাবির রিং ও প্লাস্টিকের খেলনা সামগ্রী বিক্রির জন্য দাঁড়িয়ে আছে মারুফ। তার ভ্যানে রাখা একটি সামগ্রী বিক্রি হলেই যেন সে বেজায় খুশি। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি পণ্য বিক্রি করাই যেন ১০ বছর বয়সী মারুফের জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ।
গত বছরও মারুফের সকাল শুরু হতো সহপাঠীদের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। তার বাড়ি ছিল পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আর নদীর তীব্র ভাঙনে মারুফদের ভিটেমাটি বিলীন হয়ে যায় মেঘনার পেটে। সর্বস্ব হারিয়ে জীবন বাঁচাতে মা, বাবা, ভাই-বোনকে নিয়ে তারা ঢাকার কড়াইল বস্তির একটি ছোট্ট ঘরে বসবাস করছেন। স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে প্রতিদিন সকালে উপার্জনের জন্য বাসা থেকে বের হয়ে যায় মারুফ।
স্কুলে না যেতে পেরে বেশ আক্ষেপও রয়েছে মারুফের। স্কুল আর নিজের শৈশব নিয়ে এটিএন বাংলা অনলাইনকে মারুফ বলে, “একবছর আগেও সহপাঠীদের সাথে স্কুলে গিয়েছিলাম। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। সহপাঠীদের সাথে খেলা করতাম, একসাথে দৌড়াদৌড়ি করতাম, কত আনন্দে দিন কাটত! কিন্তু নদী ভাঙনে গ্রামে আমাদের আর কিছুই নেই। ঢাকায় আসার পর আর কোথাও ভর্তি হতে পারিনি। এখন সকাল হলেই এই ভ্যান গাড়ি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাই, রাত হলে বাসায় ফিরি।”
মারুফের বাবা আরিফুল ইসলাম একজন দিনমজুর, মা রশিদা আক্তার অন্যের বাসায় বুয়ার কাজ করেন। ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে বাবা আরিফুল ইসলাম বলেন, “নদী ভাঙনে সব শেষ হয়ে যাওয়ায় ঢাকায় আসা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। বস্তির ভাড়া আর খাবার জোগাড় করতেই জীবন শেষ হয়ে যায়। ছেলেকে পড়াশোনা করানোর মতো সামর্থ্য নেই।”
রাজধানীর জিয়া উদ্যানে ফুল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মরিয়ম আক্তার। মাত্র ১১ বছর বয়সী মরিয়ম ফুল বিক্রির জন্য পথে পথে ঘুরছে। স্কুলে যাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করতেই মরিয়ম আক্তার এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলে, “পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার পরপরই বাবা-মা গ্রামের বাড়ি ভোলা থেকে ঢাকায় চলে এসেছে। মেঘনা নদীর ভাঙনে আমাদের বসতভিটা, ফসলি জমি সব শেষ হয়ে গেছে। ঢাকায় আসার পর বাবা-মা আমাকে আর কোনো স্কুলে ভর্তি করে দেয়নি।” যে বয়সে মরিয়মের স্কুলের সহপাঠীদের সাথে পড়াশোনা আর খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই মরিয়ম কখনো রাস্তায়, কখনো পার্কে ফুল বিক্রির জন্য ঘুরছে।
এটি শুধু মারুফ ও মরিয়মের জীবনের চিত্র নয়; পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, ভোলা, বরগুনা কিংবা বাগেরহাটের উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার শিশুর জীবনচিত্র আজ হুবহু একই রকম। জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাতক প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃদ্ধি পাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা। ফলে একদিকে যেমন ফসলি জমি ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে নদীভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়ছে লাখ লাখ পরিবার। আর এর প্রভাব পড়ছে নিষ্পাপ শিশুদের উপর, যারা প্রতিমুহূর্তে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার মূল স্রোত থেকে।
জলবায়ু ও শিক্ষা বিষয়ক একটি গবেষণার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়ে ঢাকায় আসা পরিবারগুলোর প্রায় ৭০% শিশু আর কখনো স্কুলে ফিরতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে প্রতিবছর উপকূল থেকে ঝরে পড়া এসব শিশুর কারণে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সার্বিক অগ্রগতি মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। উপকূল থেকে ঢাকায় এসে ছেলেশিশুরা যুক্ত হচ্ছে লেগুনার হেলপার, হকার, টোকাই বা গ্যারেজের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। আর মেয়েশিশুরা কাজ করছে গৃহকর্মী হিসেবে, অথবা অকাল বাল্যবিয়ে ও মানবপাচারের মতো ভয়াবহ ঝুঁকির শিকার হচ্ছে।
জলবায়ু সংকটে উপকূল থেকে ঢাকায় আসা শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়াসহ নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, “নদী ভাঙনের ফলে উপকূল থেকে যেসব পরিবার ঢাকায় আসে, তাদের বেশিরভাগ শিশুই অর্থের অভাবে ঢাকায় এসে আর স্কুলে যেতে পারে না। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হয়। তাদের শৈশব আবদ্ধ কুটিরে বন্দি হয়ে পড়ে।”
ঝরে পড়াসহ এসব শিশুদের নানা সমস্যা থেকে উত্তরণের বিষয়ে তিনি বলেন, “শহরে আসা স্কুলগামী শিশুদের জন্য ব্র্যাকের মতো এনজিও সংস্থার পরিচালিত স্কুলগুলোর পরিধি বাড়ানো দরকার। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা সচল রাখতে খাদ্য ও বিশেষ আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজধানীতে উদ্বাস্তু শিশুদের শনাক্ত করে তাদের জন্য সান্ধ্যকালীন বা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এই তিনটি কাজ করার পাশাপাশি সরকার এসব শিশুর প্রতি বিশেষ নজর দিলে স্কুলগামী শিশুদের ঝরে পড়ার হার অনেকটাই কমে আসবে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। শিশুদের এসব নানা সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তিনি এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, “উপকূল এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যদি সেই এলাকাতেই রেখে তাদের বাসস্থান এবং শিশুদের জন্য আলাদাভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে এসব পরিবার ঢাকায় না এসে নিজেদের এলাকাতেই থাকতে পারত। ফলে স্কুলগামী শিশুদের ঝরে পড়ার হার অনেকটাই কমে যেত।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে জলবায়ু উদ্বাস্তু শিশুদের পুনর্বাসন ও শিক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ফান্ড দাবি করা দরকার। এছাড়া উপকূল এলাকায় বন্যা ও সাইক্লোনসহনশীল মাল্টিপারপাস সাইক্লোন শেল্টারভিত্তিক বিদ্যালয় গড়ে তুললে উপকূল এলাকার শিশুদের শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ার হার কমে আসবে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের পেছনে উপকূলের নিষ্পাপ শিশুদের কোনো দায় না থাকলেও, নিজেদের শৈশব ও শিক্ষাজীবন বিসর্জন দিয়ে তাদের এর মাশুল দিতে হচ্ছে। মারুফ আর মরিয়মের মতো শিশুদের হাতে বই না দিয়ে তাদেরকে অল্প বয়সেই উপার্জনের পথে ঠেলে দিলে একটি পুরো প্রজন্ম শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অন্ধকারে তলিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।