
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
বিশ্বরাজনীতি এখন এক বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক বৈঠক কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার প্রতীক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আতিথ্য দেওয়ার পরপরই বেইজিংয়ে পুতিনের এই সফর বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। চীন-রাশিয়া বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির ২৫ বছর পূর্তিতে অনুষ্ঠিত এই সফরে পুতিন সম্পর্ককে "অভূতপূর্ব উচ্চতায়" দাবি করলেও বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি সমমর্যাদার অংশীদারিত্ব, নাকি এক ধরনের "অসম নির্ভরতার কৌশলগত অক্ষ"?
ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় পড়ে রাশিয়া যখন আন্তর্জাতিক
পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, চীন মুখে ইউক্রেন যুদ্ধে নিরপেক্ষতা ও শান্তি মধ্যস্থতাকারীর দাবি করলেও পর্দার আড়ালে রাশিয়াকে ড্রোন প্রশিক্ষণ ও সামরিক উচ্চপ্রযুক্তি সরবরাহ করে যুদ্ধ সক্ষমতা টিকিয়ে রাখছে। আসলে বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য আদর্শিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক; তারা চায় না রাশিয়া সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পশ্চিমা প্রভাবের অধীনে চলে যাক। কারণ একটি পশ্চিমবিরোধী রাশিয়া চীনের জন্য কৌশলগত বাফার ও মার্কিনবিরোধী ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে চীন একই সাথে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ (Strategic Ambiguity) বজায় রাখছে, যাতে রাশিয়ার কারণে ইউরোপ-আমেরিকার সাথে তাদের নিজস্ব বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি না হয়।
এদিকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে। ইরান-সংকট বা আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে চীনের জন্য রুশ জ্বালানির গুরুত্ব যেমন বাড়বে, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করায় বেইজিংয়ের ধৈর্যও কমছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, শি জিনপিং ব্যক্তিগত আলোচনায় পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন। ২১ শতকের ভূরাজনীতি এখন মূলত “জ্বালানি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা”-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে, যেখানে চীন ও রাশিয়া মিলে পশ্চিমা প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাতে একটি বিকল্প শক্তি-অক্ষ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এই ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশ্ব বহুমেরুকেন্দ্রিক হলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য কৌশলগত ভারসাম্যের সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি পরাশক্তিগুলোর চাপও বৃদ্ধি পাবে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, বাণিজ্য, অবকাঠামো বিনিয়োগ ও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতার সরাসরি প্রভাব পড়বে। পরিশেষে বলা যায়, বেইজিং-মস্কো অক্ষকে কেবল ‘বন্ধুত্ব’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি মূলত ক্ষমতার অসমতা, সন্দেহ ও স্বার্থের সংঘাতের মাঝে গড়ে ওঠা এক হিসাবি কৌশল। রাশিয়া আজ চীনের জন্য একটি প্রয়োজনীয় এবং সস্তা জ্বালানির উৎস হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই সমমর্যাদার অংশীদার নয়।