
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে আমরা সাধারণত সীমান্ত, সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু ডিজিটাল যুগে রাষ্ট্রের ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছে—ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ। বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, যোগাযোগ, সরকারি তথ্যভান্ডার, সামরিক প্রযুক্তি এবং এমনকি নাগরিকদের তথ্যপ্রবাহ—সবকিছুই এখন ক্রমশ ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব ব্যবস্থায় আঘাত হানা মানে কেবল একটি কম্পিউটার সিস্টেম অচল করা নয়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকেও সংকটে ফেলতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এই ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগে বড় ধরনের সাইবার হামলার জন্য প্রয়োজন হতো দীর্ঘ প্রস্তুতি, দক্ষ জনবল এবং বিপুল অর্থ। এখন AI বিভিন্ন পর্যায়ের কাজ দ্রুততর ও স্বয়ংক্রিয় করতে পারছে। লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফিশিং বার্তা তৈরি কিংবা ভুয়া অডিও-ভিডিও বানানোর মতো কাজের বাধা অনেক কমে এসেছে। ফলে সাইবার আক্রমণের সক্ষমতা শুধু বড় রাষ্ট্র বা বড় সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যুৎব্যবস্থা অচল হলে যোগাযোগ ও ব্যাংকিং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা আক্রান্ত হলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম থমকে যেতে পারে। আর এর সঙ্গে যদি একই সময়ে ভুয়া তথ্য ও ডিপফেক ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের একটি বড় সাইবার সংকট হয়তো একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা হয়ে থাকবে না। এটি একই সময়ে রাষ্ট্রের একাধিক স্তরে প্রভাব ফেলতে পারে।
ধরা যাক, কোনো দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডের একাধিক উপকেন্দ্রে সমন্বিত AI-নির্ভর আক্রমণ হলো। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল, ডেটা সেন্টার, ব্যাংকিং এবং যোগাযোগব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে। কয়েকটি খাত একসঙ্গে অচল হয়ে গেলে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ransomware হামলার সঙ্গে যদি কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর নকল করে তৈরি ডিপফেক ফোনকল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো যুক্ত হয়, তাহলে সংকটটি প্রযুক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক আস্থার সংকটে রূপ নিতে পারে।
রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে জটিল ঝুঁকিগুলোর একটি হয়তো এমন কোনো হামলা, যেখানে কোনো অবকাঠামো ধ্বংসই করা হলো না।
AI দিয়ে হাজার হাজার স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট তৈরি করে ভুয়া ভিডিও, মিথ্যা সংবাদ এবং বাস্তব সংবাদমাধ্যমের অনুকরণে তৈরি কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে মানুষের মধ্যে এমন সন্দেহ তৈরি হতে পারে যে তারা কোন তথ্যকে বিশ্বাস করবে তা নিয়েই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এখানে আক্রমণকারীর লক্ষ্য সবাইকে একটি মিথ্যা বিশ্বাস করানো নাও হতে পারে। বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করাই যথেষ্ট, যেখানে সত্য কথাটিও সন্দেহের মুখে পড়ে।
এর ফলে সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের দেওয়া প্রকৃত তথ্যও মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের তথ্য প্রচারের সক্ষমতা থাকলেও তার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। মূল লেখাটিতে এই পরিস্থিতিকে “Liar’s Dividend” ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সম্ভবত ঝুঁকিটাকে এভাবে দেখাই ঠিক নয়। আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর অধিকাংশেরই একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ও বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাকআপ এবং ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে।
বরং বড় ঝুঁকি হতে পারে ধীরে ধীরে বহুস্তরীয় অচলাবস্থা। একসঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে আঘাত, তার সঙ্গে বিভ্রান্তিমূলক তথ্যপ্রচার—এই সমন্বয় রাষ্ট্রের কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে ধীরে ধীরে দুর্বল করতে পারে।
একটি রাষ্ট্র হয়তো বিদ্যুৎ বিভ্রাট কাটিয়ে উঠতে পারে, কোনো একটি ব্যাংকিং সিস্টেম পুনরুদ্ধার করতে পারে কিংবা একটি সাইবার হামলার ক্ষতি মেরামত করতে পারে। কিন্তু যদি একই সময়ে জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা ক্ষয়ে যায়, তাহলে ক্ষতির পুনরুদ্ধার অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রথম কাজ হলো সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু প্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে না দেখা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কাঠামো।
প্রথমত, আইন ও নীতির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, যোগাযোগ, সরকারি ডেটা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা মানদণ্ড থাকতে হবে। কোনো সংকটের মুহূর্তে কে সিদ্ধান্ত নেবে, কোন কর্তৃপক্ষ কী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে এবং কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একসঙ্গে কাজ করবে—এসব আগেই নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নির্ভরতা কমানো। সংবেদনশীল সরকারি তথ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ, নিজস্ব কম্পিউটিং অবকাঠামো, স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত AI মডেল এবং একাধিক প্রযুক্তি সরবরাহকারীর ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে একক কোনো প্রযুক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে দূরে রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। সাইবার নিরাপত্তা শুধু কম্পিউটার প্রকৌশলীদের বিষয় নয়। গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি—সবগুলো ক্ষেত্রের সমন্বিত দক্ষতা প্রয়োজন। কারণ একটি AI-নির্ভর সাইবার সংকট একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
AI দিয়ে পরিচালিত দ্রুতগতির আক্রমণের বিরুদ্ধে কেবল মানুষের হাতে বসে থাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নাও হতে পারে। রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষাতেও স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
এখানে একটি বুদ্ধিমান সাইবার অপারেশন সেন্টার হাজার হাজার সতর্কবার্তা বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ হুমকি আলাদা করতে পারে। ডিজিটাল এজেন্ট সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের চিহ্ন খুঁজে বের করতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত নৈতিক ও অনুমোদিত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালিয়ে দুর্বলতা আগে থেকেই শনাক্ত করা যেতে পারে।
তবে স্বয়ংক্রিয়তার সঙ্গে মানবিক নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্যও জরুরি। ছোটখাটো প্রযুক্তিগত প্রতিক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।
সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয় ভাবলে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর বাদ পড়ে যায়—নাগরিক।
ডিপফেক, ভুয়া তথ্য ও সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক, নাগরিক সচেতনতা দুর্বল হলে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক সাইবার নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
সাইবার নিরাপত্তার আলোচনায় আরেকটি বিষয়ও সামনে রাখতে হবে—কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। ভবিষ্যতে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমানের কিছু এনক্রিপশন পদ্ধতি ভেঙে দিতে সক্ষম হলে আজ সংগ্রহ করা এনক্রিপ্টেড তথ্যও ভবিষ্যতে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে রাষ্ট্রগুলোর এখন থেকেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ব্যবস্থায় ব্যবহৃত এনক্রিপশন পদ্ধতির তালিকা তৈরি, দীর্ঘমেয়াদি সংবেদনশীল তথ্য চিহ্নিত এবং কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
AI-এর যুগে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কোনো হামলা হবে কি না, তা নয়; বরং হামলা হলে রাষ্ট্র কত দ্রুত তার স্বাভাবিক কার্যক্রম ধরে রাখতে পারবে।
একটি রাষ্ট্রের বিদ্যুৎব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে, ব্যাংকিং সিস্টেম আক্রান্ত হতে পারে, সরকারি সার্ভারে অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। কিন্তু এসব সংকটের মধ্যেও যদি রাষ্ট্র বিকল্প ব্যবস্থায় চলে যেতে পারে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং জনগণকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে, তাহলে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তাই সাইবার নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য শুধু আক্রমণ ঠেকানো নয়; আক্রমণের মধ্যেও রাষ্ট্রকে কার্যকর রাখা।
এ জন্য প্রয়োজন আইন, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, বিকল্প অবকাঠামো, নিয়মিত সাইবার মহড়া এবং জনগণের সচেতনতা—সবকিছুর সমন্বয়। কারণ ভবিষ্যতের সাইবার যুদ্ধ হয়তো কোনো একটি কম্পিউটার বা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে হবে না। তা হতে পারে একটি রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ, অর্থনীতি, তথ্যব্যবস্থা এবং জনগণের আস্থার বিরুদ্ধে একযোগে পরিচালিত আক্রমণ।
রাষ্ট্রগুলো তাই এখন যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা শুধু আজকের নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে না; বরং সংকটের মুহূর্তে তারা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সেটিও নির্ধারণ করবে।
মারুফ/