
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার বাসিন্দা আমেনা বেগম। নয় মাস আগে মেঘনার নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবার নিয়ে ঢাকায় এসেছেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিঃস্ব হয়ে বর্তমানে ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তির ৬ বর্গফুটের এক আলো-বাতাসহীন কক্ষে তাঁদের সাতজনের সংসার। উপকূলের নদী আমেনা বেগমের ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়েছে, আর ঢাকা কেড়ে নিচ্ছে তাঁর বেঁচে থাকার ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা।
চল্লিশ বছর বয়সেই জীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের সাক্ষী হয়েছেন আমেনা বেগম। নদীভাঙনের পর ঢাকায় এসে নিজের পরিবারের জীবনযাপন নিয়ে তিনি এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, দশ বছর আগেও নিজেদের বসতভিটা ছিল, কৃষিজমি ছিল—সবকিছু নদীভাঙনে শেষ হয়ে গেছে।এলাকায় থাকার কোনো উপায় না পেয়ে সপরিবারে ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য
নদীভাঙনের কবলে পড়ে নিজের জন্মস্থান নোয়াখালীর হাতিয়া ছেড়ে ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের বস্তিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন সাইফুল ইসলাম (৪৫)। এক বছর ধরে ক্ষুদ্র একটি কক্ষে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন তিনি।
নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে ঢাকায় এসে আরও বেশি বিপাকে পড়ার কথা জানিয়ে এটিএন বাংলা অনলাইনকে সাইফুল ইসলাম বলেন, নদী থেকে আমরা বেঁচে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু ঢাকার এই ঘিঞ্জি বস্তিতে আমাদের প্রতিদিন একটু একটু করে মৃত্যু হচ্ছে। বৃষ্টির দিনে ঘরে পানি পড়ে, আর গরমের দিনে ছোট্ট একটা রুমে সবাইকে নিয়ে বসবাস করতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। তিনি আরও বলেন, গ্রামে ভিটেমাটি হারিয়ে যাঁরা বস্তিতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসনের অভাবে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
আমেনা বেগম ও সাইফুল ইসলামের মতো ভোলা, নোয়াখালী ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলার অসংখ্য মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রতিনিয়ত ঢাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। আর রাজধানীতে পৌঁছানোর পর নগর ব্যবস্থার নানা সংকটের মুখে তাঁদের কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র লবণাক্ততার কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২,০০০ মানুষ নতুন করে ঢাকায় আসছেন। জলবায়ু অভিবাসীদের এই অনিয়ন্ত্রিত স্রোত ঢাকার মূল অবকাঠামোগত ভিত্তি আবাসন, পানি ও স্বাস্থ্যসেবাকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। জলবায়ু অভিবাসীদের সংকটের কথা তুলে ধরে এটিএন বাংলা অনলাইনকে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভোলা, সাতক্ষীরা, হাতিয়াসহ বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার নদীপাড়ের মানুষ বাধ্য হয়ে ঢাকায় ছুটে আসছে। কিন্তু এখানে এসে তারা তীব্র আবাসন সংকটসহ বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব মানুষকে ঢাকায় না এনে সরকারি উদ্যোগে নিজ নিজ এলাকাতেই সুযোগ-সুবিধা ও আবাসনের ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হতো।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা, এটি পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়। তবে এর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে দীর্ঘমেয়াদে—অর্থাৎ ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদী নানা কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। আমাদের দ্রুত অভিযোজনের (Adaptation) দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বিশ্বজুড়ে মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র ০.২৮% থেকে ০.৪০%। এত কম অবদান থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাশুল সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বৈশ্বিক দরবারে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকায় আসা জলবায়ু অভিবাসীদের প্রায় ৮০ শতাংশের প্রথম ও শেষ আশ্রয়স্থল হয় কড়াইল, সাততলা, ভাসানটেক, কামরাঙ্গীরচর বা কাপ্তানবাজারের মতো অপরিকল্পিত বস্তিগুলো। এখানে অধিকাংশ পরিবারকে একটিমাত্র ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। বস্তিগুলোর জনঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে বহু গুণ বেশি।
জলবায়ু অভিবাসীদের রাজধানীমুখী হওয়ার প্রভাব নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহর তার ধারণক্ষমতার চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি মানুষ বহন করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর যে হারে জলবায়ু অভিবাসীরা ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে নগরের অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে। ঢাকাকে যদি এখনই আন্তর্জাতিক মানের, পরিবেশবান্ধব ও সহনশীল অবকাঠামোর আওতায় আনা না হয়, তবে এই ক্রমবর্ধমান চাপ একদিন রাজধানীর পুরো ব্যবস্থাপনাকেই স্থবির করে দেবে।